Thursday, 23 July 2020

জাপানের রাজধানীর জন্য আজ দুঃখের দিন


জাপানের রাজধানী টোকিওর জন্য আজ বৃহস্পতিবার হচ্ছে দুঃখের দিন। দুঃখের কারণ অবশ্য একাধিক। শুরুতেই যেটার কথা বলতে হচ্ছে, তা হলো আসি আসি করেও অলিম্পিকের না আসা। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামীকাল শুক্রবার অলিম্পিকের জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনীর জন্য নির্ধারণ করা ছিল। এ কারণে আজ বৃহস্পতিবার থেকেই হওয়ার কথা ছিল অলিম্পিককে স্বাগত জানানোর নানা রকম অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে এক বছর আগেই সরকার চলতি সপ্তাহের সোমবারের সমুদ্র দিবসের সরকারি ছুটির দিন বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই পিছিয়ে এনে একই সঙ্গে ২৪ জুলাইকে ক্রীড়া দিবস ঘোষণা করে ছুটির দিনের সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়েছিল। সরকারের ধারণা ছিল, চার দিনের ছুটি সামনে রেখে অলিম্পিক শুরু হলে জনগণ প্রতিযোগিতার সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে অলিম্পিকের আয়োজন এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও জাপানের নাগরিকদের জন্য ছুটির দিন খারিজ হয়ে যায়নি। সপ্তাহান্তের ছুটি নিয়ে টানা চার দিনের ছুটি তাঁরা এখন উপভোগ করছেন, যদিও ছুটি থাকলেও বাইরে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। সরকার অবশ্য সরাসরি বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। তবে ভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজে মুক্ত থাকা এবং অন্যদের মুক্ত রাখতে যতটা সম্ভব ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ নগরবাসীদের দিচ্ছে সরকার। ফলে অনেকটা বিষণ্ন মন নিয়েই ঘরে বসে কাটাতে হচ্ছে ছুটির সময়।

অন্যদিকে দুঃখের বোঝা আজ আরও একটু ভারী হয়ে এসেছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ চিহ্নিত হওয়ার দৈনিক হিসাব প্রকাশিত হওয়ার পর। জাপানের রাজধানীতে আজ ৩৬৬টি নতুন সংক্রমণ চিহ্নিত হয়। এটা এ পর্যন্ত হিসাবের মধ্যে আসা সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে হিসাবে ওঠানামা লক্ষ করা গেলেও ৩০০–এর মাত্রা তা কখনো অতিক্রম করেনি। আর এখন এক লাফে তা উঠে গেছে ৩৬৬–তে। এর আগে সর্বোচ্চ হিসাব ২৯৩টি রেকর্ড করা হয় চলতি মাসের ১৭ তারিখে। ফলে কিছুটা হলেও ভীতি দানা বাঁধতে শুরু করেছে মানুষের মনে। আর তাই দীর্ঘ ছুটিতে ঘরে বসে থাকাকেই অনেকে যুক্তিসংগত ও নিরাপদ ভেবে নিচ্ছেন।

রাজধানী টোকিওর পাশাপাশি জাপানের অন্যত্রও সংক্রমণের হিসাব এখন আবার উঠতির দিকে। দেশজুড়ে আজ এক দিনে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে ৭৯৫টি, যা হচ্ছে এক দিনের গণনায় সর্বোচ্চ রেকর্ড। রাজধানীতে আজকের সর্বোচ্চ হিসাব প্রকাশিত হওয়ার পরপর টোকিওর গভর্নর ইয়ুরিকো কোইকে সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি চাইছেন রাজধানীবাসী যেন ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে সতর্ক থাকেন এবং দীর্ঘ ছুটির সময় নিজেদের রক্ষা করায় আরও বেশি যত্নশীল হন।তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা দরকার, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে বিরাজমান মতপার্থক্য দৃশ্যত বেড়ে চলেছে। জাপান সরকার অর্থনীতি নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, জনস্বাস্থ্য নিয়ে মনে হয় ততটা নয়। অন্যদিকে টোকিও ও অন্যান্য বড় নগরকেন্দ্রের স্থানীয় প্রশাসন ভাইরাসের বিস্তার বন্ধ করাকে সর্বাগ্রে করণীয় বলে মনে করছে। ফলে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার দৈনিক সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার এটাকে দ্বিতীয় আঘাত হিসেবে দেখছে না। উল্টো টোকিওর গভর্নর বলছেন, রাজধানীর লোকজন যেন দ্বিতীয় আঘাত এসে পড়েছে ধরে নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
কেন্দ্রীয় সরকার নিজস্ব অবস্থান থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসার জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করে দিয়ে কঠিন অবস্থা থেকে এদের বের করে আনার উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। যদিও সে রকম উদ্যোগের কয়েকটি ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ভাইরাস সংক্রমণের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত একটি খাত পর্যটন ও হোটেলশিল্পকে সাহায্য করার জন্য ‘গো টু ট্রাভেল’ নামের যে পরিকল্পনা সরকার হাতে নেয়, সেখানে জনগণকে ছুটির সময় দেশের ভেতরের অন্যান্য গন্তব্য ভ্রমণ উৎসাহিত করতে বিশেষ ভর্তুকি ও ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শুরুতে সমগ্র দেশ এর আওতায় থাকলেও সমালোচনার মুখে রাজধানীকে এর বাইরে রাখতে সরকার শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়। তবে তারপরও জাপানের ছোট অনেক শহর বলছে, বড় নগরকেন্দ্রগুলো থেকে লোকজনের মাধ্যমে তাদের অঞ্চলে এসে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ুক, সেটা তারা দেখতে চাইছে না।
অন্যদিকে টোকিও অলিম্পিকের আয়োজন এক বছর পিছিয়ে গেলেও জাপানে অনেকেই এখন মনে করছেন, অলিম্পিকের চিন্তা জাপানকে হয়তো শেষ পর্যন্ত একেবারেই বাদ দিতে হতে পারে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের দাপট এখনো ঊর্ধ্বমুখী। এ ছাড়া ভবিষ্যতে কখন এটা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং নিয়ন্ত্রণে এলেও সংক্রমণ আবারও ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করায় অন্যান্য দেশ সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে কি না, সে রকম অনিশ্চিত নানা দিক থেকে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত হয়তো একেবারেই ভন্ডুল হয়ে যাবে অলিম্পিকের আয়োজন।
জাপানের বার্তা সংস্থা কিওদো নিউজের গত রোববার প্রকাশিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, মাত্র ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, আগামী বছর অলিম্পিকের আয়োজন তাঁরা দেখতে চান। অন্যদিকে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ অলিম্পিক আরও পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা মনে করেন না, ২০২০ টোকিও অলিম্পিক আদৌ অনুষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) এর আগে বলেছিল, আগামী বছরের জুলাই মাসে অলিম্পিকের আয়োজন হবে টোকিওর জন্য শেষ সুযোগ এবং এর বাইরে আরও পিছিয়ে দেওয়ার পথ একেবারেই খোলা নেই।
আইওসির পূর্বঘোষিত সেই সিদ্ধান্তকে আমরা যদি চূড়ান্ত হিসাবে ধরে নিই, তবে দেখা যায় শেষের দুই পক্ষের সম্মিলিত হিসাব, অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি সম্ভবত ধরেই নিয়েছেন, দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শিগগিরই আর টোকিওতে আসছে না। বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করা এবং ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার পরও অলিম্পিক বাতিল হয়ে যাওয়া আসলেই হবে দুঃখজনক। তবে এ জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করার উপায় নেই। নতুন করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি ছিল শূন্যের ঘরে। দুঃখজনক হলেও সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় এখন একেবারেই নেই।

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: