Saturday, 18 July 2020

'আমাকে পেলে তো ধর্মান্ধরা ওভাবেই টুকরো টুকরো করে কাটবে'


সম্প্রতি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে নৃশংসভাবে খুন হওয়া তরুণ উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহকে নিয়ে ফেসবুকে ভেরিফায়েড পেইজে স্ট্যাটাস দিয়েছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।  পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো- 
নিউ ইয়র্ক শহরে- অর্থাৎ ম্যানহাটনে আমি একসময় বাস করেছি। তখন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে আমি একটা ফেলোশিপ করছিলাম। ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি কোথাও আমাকে থাকতেই হতো। আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গেই, ওয়াশিংটন স্ট্রিটে। যে স্ট্রিটের ওপরই ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। এলাকাটাকে ডাউনটাউন বলে, হাডসন নদীর পারেই। আবাসিক এলাকা হিসেবে মোটেও জনপ্রিয় নয়। তাই শহরের অন্যান্য ভালো আবাসিক এলাকার চেয়ে ভাড়াও বেশ কম ছিল। ইয়ুপ্পিদের বসবাসের জন্যই মূলত বিল্ডিংগুলো তৈরি। YUPpie মানে ইয়ং আরবান প্রফেশনাল। 
২৩ তলায় আমার অ্যাপার্টমেন্টে ছিল ছোট একখানা স্টুডিও, কিন্তু ওতেই আমি খুশি ছিলাম, কারণ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দেখা যেত হাডসন আর ইস্ট রিভার, দেখা যেত এলিস আইল্যান্ড। আর মাথা খুব কাত করলে লিবার্টি স্ট্যাচু। বিল্ডিংটায় ছিল ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তারক্ষী। অচেনা সবাইকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে বসা নিরাপত্তা রক্ষীরা থামাত, কোথায় কোন ফ্লোরে কার কাছে যাবে জিজ্ঞেস করা হতো, যার কাছে যাবে তাকে রক্ষীরা জানাত, সে যদি অনুমতি দিত, তবেই আগন্তুক তার কাছে যেতে পারত। আগন্তুককে অবশ্য নিরাপত্তারক্ষীদের খাতায় লিখে আসতে হতো সব, নিজের নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর, সই -- কটার সময় এলো -- সব।
আমাদের ওই সাধারণ মানের বিল্ডিংয়েই যদি নিরাপত্তার ব্যাপারে এত কড়াকড়ি, তাহলে ধনীদের এলাকায়, যেখানে মিলিয়নিয়ার বিলিয়নিয়াররা বাস করে, সেখানে কী অবস্থা। আপার ইস্ট সাইডের লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্টে এক পরিচিত মহিলার সঙ্গে  কয়েক বছর আগে দেখা করতে গিয়েছিলাম । ওরে বাপ রে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করে তারপর ভেতরে ঢুকতে দিল। অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকছি না তো যেন ফ্লাই করার জন্য এরোপ্লেনে ঢুকছি।
আজ সকালে ফাহিম সালেহর হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় এলো, তা হলো- খুনি কী করে ঢুকল ওই বিল্ডিংয়ে। সিকিউরিটির লোকেরা কোথায় ছিল? ফাহিমের অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ২.২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে কেনা। প্রচণ্ড ধনী লোকদের বাস বিল্ডিংয়ে। ধনীরা নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। তাই বলছি, কালো পোশাকে আবৃত খুনিটি যে কোনো অ্যাপার্টমেন্টে বাস করে না, তা তো সিকিউরিটির লোকেরা জানত, তাহলে থামায়নি কেন? খুনিটি টুকরো টুকরো করে কেটেছে ফাহিমকে। ইলেকট্রিক করাত নিয়ে গিয়েছিল কাটার উদ্দেশ্যেই। মাথা, পা, হাত প্লাস্টিকের ব্যাগেও ভরেছে। টুকরোগুলো কি সে যাওয়ার সময় নিয়ে যেতে চেয়েছিল? কিন্তু নেবেই বা কেন? পাশের অ্যাপার্ট্মেন্টের লোকেরা ফাহিমের আর্তচিৎকার শুনেছে, কিন্তু পুলিশে কল করেনি। এ-ও খুব বিজার।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সী উদ্যমী পরিশ্রমী স্বপ্নবান যুবকটিকে কারা মেরেছে, আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে। হত্যার পেছনে, পুলিশ জানিয়েছে, সম্ভবত অর্থকড়ির বিষয় জড়িত ছিল। অল্প বয়সেই প্রচুর কাজ করেছেন, নতুন নতুন আইডিয়ার জন্ম দিয়েছেন, নতুন নতুন অ্যাপ বানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন কোম্পানি গড়েছেন ফাহিম। নাইজেরিয়ার শহরে ভিড়ের রাস্তায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা ক্লান্ত মানুষকে ফাহিমের তৈরি গোকাডা কম্পানি রাইড দেয় , বাংলাদেশে তাঁর পাঠাও কম্পানি একই কাজ করে, মানুষকে বাইকে রাইড দেয়। মানুষের সময় বাঁচে। মানুষ স্বস্তি পায়। এ রকমই তো জানি। তাহলে কে বা কারা হিটম্যান পাঠাবে ওকে কেটে টুকরো করার জন্য? ভালো কাজ করা মানুষের এত বড় শত্রু কি থাকে? নিশ্চয়ই থাকে। আমারই তো আছে। মানুষের ভালোর জন্য চল্লিশ বছর ধরে লিখছি, আমাকে পেলে তো ধর্মান্ধরা ওভাবেই টুকরো টুকরো করে কাটবে।
মানুষের মতো ভালো প্রাণী জগতে কেউ হয় না, মানুষের মতো নৃশংসও কেউ হয় না।
-তসলিমা নাসরিনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: